ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশ সীমান্তে নির্বিচার গুলিতে একের পর এক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক আইন ও ধর্মীয়-নৈতিকতার পরিপন্থী।
সাত মাসে ২২ জন নিহত
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই সীমান্তে ২২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে বিএসএফ। আহত হয়েছেন অন্তত ৩২ জন। প্রতিবারই ভারতের পক্ষ থেকে ‘ভুলবশত’ বা ‘আত্মরক্ষার জন্য’ গুলি ছোড়ার ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও থেমে নেই এই হত্যাযজ্ঞ।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে মোট ৬০৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।
ফেলানী থেকে স্বর্ণা: থামেনি হত্যা
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম সীমান্তে ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানী খাতুনকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ। তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী স্বর্ণা দাস (১৪) কে গুলি করে হত্যা করা হয়। মা সঞ্জিতা রানী দাসের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরায় ভাইকে দেখতে যাওয়ার সময় বিএসএফ তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।
২০২৩ সালেও বিজিবির সদস্য রইসউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করেছিল বিএসএফ, যার ব্যাখ্যা ছিল ‘ভুলবশত’।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে আইন-বহির্ভূত হত্যা। নিহতরা কেউই সশস্ত্র ছিলেন না। কাজেই আত্মরক্ষার প্রশ্নও ওঠে না”।
উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে চীন, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ আরও পাঁচটি দেশের স্থলসীমান্ত থাকলেও শুধু বাংলাদেশের সঙ্গেই নিয়মিত প্রাণঘাতী ঘটনার নজির দেখা যায়। চীনের সঙ্গে নিরস্ত্র সীমান্ত পাহারার চুক্তি থাকলেও, বাংলাদেশের একই প্রস্তাবে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বাড়ছে কূটনৈতিক উদ্বেগ
চলতি বছরের শুরুতেই দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের যৌথ সম্মেলনে সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনার ঘোষণা এলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনার মাধ্যমে এই অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান না হলে দুই দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এর ফলে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিনষ্ট হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং ঘাঁটি গেড়ে বসতে পারে।
সমাধানের দাবি
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ সীমান্তে একটি স্বাধীন সিভিল কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই হত্যা বন্ধ করতে হলে কেবল আলোচনা নয়, দরকার কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও উঠছে।
বৃহৎ আকারে যুদ্ধের সূচনা এড়াতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা