শুধু ডলার-পাউন্ড নয়, শিক্ষায়ও সিলেটকে ফার্স্ট হওয়ার তাগাদা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আনম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘সিলেট সবসময় ফার্স্ট হয়। তবে শুধু ডলারে আর পাউন্ডে না, পড়ালেখায়ও (শিক্ষায়) ফার্স্ট হতে হবে। পাবলিক পরীক্ষায় সিলেটের ফলাফল লন্ডনের ওয়েদারের মতো উঠানামা করে।’বুধবার সিলেট নগরের মেন্দিবাগ এলাকার অডিটোরিয়ামে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত কেন্দ্রসচিবদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনিএসব কথা বলেন।সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এখানে অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু সেই আর্থিক শক্তি শিক্ষার মানোন্নয়নে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে একই অঞ্চলের ভেতরেই সুযোগের অসম বণ্টন দেখা যাচ্ছে।’দেশে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একাধিক ধারার অস্তিত্ব থাকলেও তা কোনোভাবেই সরকারি নীতিমালার বাইরে থাকতে পারে না। বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধি-বিধানের বাইরে থাকবে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই খাতকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করা হয়েছে এবং একটি কার্যকর রেগুলেটরি বোর্ড গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।’শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, কারিকুলামের সামঞ্জস্য এবং শিক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষা যদি শুধুমাত্র বিত্তবানদের নাগালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে সামগ্রিকভাবে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হবে। সরকার চায় দেশের প্রতিটি শিশুই মানসম্মত শিক্ষা পাবে সে ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মাধ্যম বা মাদরাসা যেখানেই পড়ুক না কেন। এজন্য একটি সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনা হবে।’শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জোরদার, এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার।এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকেও দায়িত্বশীল, ভূমিকা রাখতে হবে।’ কোচিং সেন্টারকে আইনের আওতায় আনা হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকরা ফেইলিওর হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারে যায়। শিক্ষকরা ভালো করে পড়ান না বলেই নকল করে। আগের দিনে জেলার স্কুলগুলো ছিল নাম্বার ওয়ান। কারণ ডিসি-এসপিদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতো।’মতবিনিময় সভায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয়লেন প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর করার বিষয়টি উপস্থাপন হয়। এ নিকায়ন্ত্রী বলেন, ‘কেট জায়গা দিলে উনার নামে স্কুল করে দেব। বিল্ডিং আমরা করব।’সভায় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে সিলেটের জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এসময় তিনি বলেন, ‘প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সিলেটে একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে দূরদর্শী পরিকল্পনা করেছিলেন, বিগত সরকারের অবহেলার কারণে তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।’এ অঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে স্বাবলম্বী করতে তিনি দ্রুত সিলেটে একটি প্রকৌশলবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে অপরাজনীতি মুক্ত রেখে এর সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রদানের অনুরোধ জানান।তিনি আরও বলেন, ‘জেলায় বর্তমানে ৮৫০টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার স্কুলগুলোতে ভবন ও শিক্ষক সংকট চরমে পৌঁছেছে। ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের সবকটি পদই শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনি দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ ও নতুন ভবন নির্মাণের তাগিদ দেন। এছাড়া তিনি কোম্পানীগঞ্জের এম. সাইফুর রহমান কলেজকে সরকারিকরণ এবং আলিয়া ও কওমি মাদরাসার উন্নয়নে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ জানান।কওমি মাদরাসা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের বিষয়েও তিনি শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন সিলেটের শিক্ষা বিস্তারে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট নিরসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’ তিনি জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী মন্ত্রী আরিফুর
হক চৌধুরী, সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, সংসদ সদস্য কয়ছর আহমদ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দীন চৌধুরী, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রুহুল আমিন, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিয়া মো. নূরুল হক, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীসহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।