মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি :
গত দুই দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ঘন ঘন বজ্রপাতের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির তীব্রতা যেমন জনজীবনকে স্থবির করেছে, তেমনি বজ্রপাতের আকস্মিক আঘাত মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত আমাদের দেশের জন্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এর তীব্রতা, সময়কাল ও আচরণে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বজ্রপাত এখন বাংলাদেশে একটি নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছরই এর কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যার বড় অংশই গ্রামীণ কৃষিশ্রমিক ও খোলা মাঠে কাজ করা মানুষ। বজ্রপাতের ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ নয়; গবাদিপশু মারা যাওয়া, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোসহ এসবও এর সরাসরি প্রভাব। এছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কৃষিজমির ক্ষতি, রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়া এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই চিত্রের একপাশে যেমন ঝুঁকি ও ক্ষতির হিসাব রয়েছে, অন্য পাশে কিছু প্রাকৃতিক উপকারিতাও অস্বীকার করা যায় না। বজ্রপাতের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন মাটিতে মিশে প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে, যা ফসল উৎপাদনে সহায়ক। ভারী বৃষ্টিপাত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার করে, নদী-খাল-বিলের পানি বৃদ্ধি করে এবং শুষ্ক মৌসুমের জন্য পানির সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ প্রকৃতি নিজেই তার ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। সমস্যা হচ্ছে আমরা সেই ভারসাম্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি কি না। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা ও প্রস্তুতি। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে কাজ করা থেকে বিরত থাকা, উঁচু গাছ বা খুঁটির নিচে আশ্রয় না নেওয়া, মোবাইল ফোন ব্যবহার কমানো, ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকা, কারণ মৌলিক সতর্কতা জীবন বাঁচাতে পারে। গ্রামে গ্রামে বজ্রনিরোধক (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন এবং স্কুল-কলেজে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো অতি জরুরি। একই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কি শুধুই প্রকৃতির ওপর দোষ চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারি? নিশ্চয়ই না। অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত বসতি, জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতায় মানবসৃষ্ট সমস্যাই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। তাই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।এই দুই দিনের চলমান ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাত আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতি তার নিয়মেই চলবে, কিন্তু সেই নিয়মের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। সচেতনতা, প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্ষতি কমিয়ে এনে আমরা এই প্রাকৃতিক ঘটনাকেই সহনীয় করে তুলতে পারি। অন্যথায়, প্রতি বছরই একই চিত্র, একই ক্ষতি আর একই শোকের পুনরাবৃত্তি আমাদের নিয়তি হয়ে থাকবে।