মোসাঃ সুরাইয়া পারভীন,স্টাফ রিপোর্টার।
১৯২৩ সালের ঐতিহাসিক বয়লার আইন আধুনিকায়নের দোহাই দিয়ে ২০২২ সালে প্রণীত ‘কালো আইন’ বাতিল, অর্জিত সনদ বহাল এবং প্রধান বয়লার পরিদর্শকের অপসারণের দাবিতে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আজ ১৭ই অক্টোবর (শনিবার) সকালে রাজধানীর মিরপুর বিসিআইসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ও অংশগ্রহণকারী একাধিক বয়লার পরিচারক রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আন্দোলনরত বয়লার পরিচারক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, মহামান্য হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ অমান্য করে আজ বিসিআইসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক ‘তৃতীয় গ্রেড’-এর পরীক্ষা আয়োজনের চেষ্টা চালায় প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়। খবর পেয়ে ক্ষুব্ধ বয়লার পরিচারকরা কেন্দ্র প্রাঙ্গণে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেন। এ সময় প্রধান বয়লার পরিদর্শক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মান্নানের নির্দেশে ও সহায়তায় আন্দোলনকারীদের ওপর পেটুয়া বাহিনী ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা বেধড়ক মারধর চালায়। এতে বেশ কয়েকজনের মাথা ফেটে রক্ত ঝরে এবং অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হন।
‘সনদ’ থেকে ‘লাইসেন্স’: ক্ষোভের নেপথ্যে কালাকানুন
বয়লার পরিচারকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা ১৯২৩ সালের আইনের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ‘সনদপত্র’ (Certificate) অর্জন করে শিল্প কারখানায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের অসাধু চক্রান্তে ‘বয়লার আইন, ২০২২’ পাস করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে পরিচারকদের অর্জিত সনদের গুরুত্ব কমিয়ে কেবল ‘লাইসেন্সে’ রূপান্তর করা হয় এবং তাদের পদমর্যাদা কমিয়ে ৩য় গ্রেডে নামিয়ে আনার পাঁয়তারা চালানো হয়।
এই বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন বয়লার পরিচারক সংগঠন মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত পরীক্ষা গ্রহণ ও বিধিমালার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। কিন্তু বিচারিক নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় বারবার পরীক্ষা আয়োজনের অপচেষ্টা ও অবৈধ ট্রেনিং সেন্টারের নামে অর্থবাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিক নেতাদের।
অভিভাবক যখন নিপীড়ক
আন্দোলনরত এক প্রবীণ বয়লার পরিচারক আক্ষেপ করে বলেন, “বয়লার পরিচারকরা অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসেনি। এই প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় থেকেই পরীক্ষা দিয়ে সনদ পেয়ে আজ দেশের শিল্প খাতকে সচল রেখেছেন তাঁরা। নীতি অনুযায়ী উনারা আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকতুল্য। কিন্তু দুর্নীতির সিন্ডিকেট বজায় রাখতে ও নিজেদের অপরাধ ঢাকতে আজ আমাদের রক্তে হাত রাঙালেন প্রধান বয়লার পরিদর্শক আব্দুল মান্নান ও তাঁর দোসররা।”
চার দফা দাবি ও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ আজকের এই ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে চার দফা দাবি পেশ করেন:
মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে অবিলম্বে ৩য় গ্রেডের অবমাননাকর পরীক্ষা বন্ধ করা এবং পূর্বের ১ম ও ২য় শ্রেণীর সনদের পূর্ণ মর্যাদা বহাল রাখা।
আদালত অবমাননা, শ্রমিক নির্যাতন ও দুর্নীতিতে অভিযুক্ত প্রধান বয়লার পরিদর্শক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মান্নানকে অবিলম্বে পদত্যাগ ও বরখাস্ত করে আইনের আওতায় আনা।
মিরপুরে আজকের মানববন্ধনে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা।
ট্রেনিং সেন্টারের নামে অর্থবানিজ্য ও সার্টিফিকেট সিন্ডিকেট অবিলম্বে বন্ধ করা।
নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে দুর্নীতিবাজ প্রধান বয়লার পরিদর্শকের বরখাস্ত ও কালাকানুন বাতিল করা না হলে সারা দেশের শিল্পকারখানায় একযোগে বয়লার পরিচালনা বন্ধসহ কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়া হবে।