মোঃ খোকন নেত্রকোণা প্রতিনিধি
প্লে ক্লাসের কান্না পেরিয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে এগিয়ে যাচ্ছে মো. মাহফুজ খান হামীমবয়স তখন মাত্র চার বছর। স্কুলে যাওয়ার কথা শুনলেই কান্না করত। ক্লাসে বসেও বলত, ‘ক্লাস করব না, বাসায় চলে যাব।’ সেই শিশুই আজ এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ অর্জন করেছে। বাবা-মায়ের ভালোবাসা, ধৈর্য, পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের পরিশ্রমে এই সাফল্য অর্জন করেছে সে।২০০৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্ম নেয় হামীম। তার বাবা মো. সুমন খান এবং মা হাসি আক্তার। দুই ভাই-বোনের মধ্যে হামীম বড়। ছোট বোন আরিয়া মেহেজাবীন বর্তমানে নার্সারি শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।হামীমের পরিবারের আদি নিবাস নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। তবে বাবার এস কিউ সেলসিয়াস লিঃ-এ চাকরির সুবাদে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা কেন্দ্রিক জীবনযাপন করে আসছে। ফলে গ্রামের বাড়িতে থাকা হয়েছে খুবই কম।স্কুলজীবনের শুরুটা ছিল কান্নায় ২০১৪ সালে মাত্র চার বছর বয়সে গাজীপুরের জৈনা বাজারের এইচ.এ.কে একাডেমিতে প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হয় হামীম। কিন্তু শিক্ষাজীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিদিন বাবা-মা তাকে কোলে-কাঁখে করে স্কুলে নিয়ে যেতে হতো।
ক্লাসে বসেই শুরু হতো কান্না। তার একটাই কথা—‘ক্লাস করব না, বাসায় চলে যাব।’ অনেক দিন বাবা-মাকে ক্লাসরুমে বসে থেকে তাকে সামলাতে হয়েছে। ধৈর্য ধরে পাশে থেকেছেন, যেন স্কুলভীতি কাটিয়ে উঠতে পারে তাদের সন্তান।এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হামীমের ছোট মামা মো. আসাদুল আলম। বাসায় বেড়াতে এলে তিনিও সকালে ঘুম থেকে তুলে ভাগ্নেকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। ক্লাসে কান্না করলে পাশে বসে থাকতেন এবং ক্লাস শেষে নিজে তাকে বাসায় ফিরিয়ে আনতেন।
দ্বিতীয় শ্রেণি থেকেই বদলে যায় হামীম।সময় গড়াতে গড়াতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর বদলে যেতে শুরু করে হামীম। তার মধ্যে তৈরি হয় নতুন আত্মবিশ্বাস। পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে ওঠে সে। এরপর থেকে ক্লাসে তার রোল নম্বর সবসময় প্রথম পাঁচের মধ্যেই থেকেছে।পাশাপাশি একাধিকবার স্থানীয় মেধাবৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে বৃত্তিও অর্জন করেছে হামীম।হামীমের এই সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করে সে। বাবা মো. সুমন খানের পরিশ্রম ও সততা ছোটবেলা থেকেই কাছ থেকে দেখেছে হামীম। পরিবারের পক্ষ থেকেও তাকে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে। হামীমের ভাষায়, ‘বাবা-মায়ের জন্যই আজ আমি এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।’
নানাবাড়ির নানাভাই, নানু, বড় খালামনি ও মামাদের আদর-স্নেহেও বেড়ে উঠেছে হামীম। বিশেষ করে ছোট মামা আসাদুল আলম তাকে নিয়মিত পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার জন্য উৎসাহ দিতেন।
তার মামার একটি কথা হামীমের মনে গেঁথে আছে—‘বাবা, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো।’পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা।শুধু বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না হামীমের জীবন। পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল ও ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করত সে। পরিবারের সহযোগিতা ও ভালোবাসায় পড়াশোনার সঙ্গে খেলাধুলাও চালিয়ে গেছে। এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস অর্জনের পর হামীমের সামনে এখন আরও বড় স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার বাবার বহু বছরের একটি প্রত্যাশা।হামীমের জন্মের পরপরই তার বাবা সুমন খান ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন—ছেলে বড় হয়ে একদিন ডাক্তার হবে।আজ এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার পর বাবার সেই স্বপ্নই নিজের স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করেছে হামীম। ঢাকার একটি ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় সে। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। হামীমের ভাষায়, ‘আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। এখন বাকি পথ চলার জন্য সবার দোয়া ও সহযোগিতা চাই।’প্লে ক্লাসের সেই কান্নাভেজা দিন থেকে এসএসসির গোল্ডেন এ প্লাস—হামীমের এই পথচলা শুধু একটি ফলাফলের গল্প নয়। এটি বাবা-মায়ের ভালোবাসা, পরিবারের ত্যাগ এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।