
মোঃ আলমগীর হোসাঈন, ষ্টাফ রিপোর্টার:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ড্রেজার দিয়ে অবাধে কৃষিজমি, পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে এসব অবৈধ কার্যক্রম চললেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন আবাদি জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমছে, অন্যদিকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে ফসলি জমি ও পুকুর ভরাট করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের সুযোগ নিয়ে নিচু জমি, পুকুর এবং ডোবাগুলো বালু ও মাটি দিয়ে দ্রুত ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ড্রেজার সিন্ডিকেটের কবলে। চান্দুরা ইউনিয়নের পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সংলগ্ন আমতলী থেকে ডাকবাংলা সড়কের আশপাশের উর্বর কৃষিজমি বালু দিয়ে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। একই চিত্র দেখা গেছে চর ইসলামপুর ও চান্দুরা ইউনিয়নের রসুলপুর এলাকাতেও। সেখানে একের পর এক কৃষিজমি, পুকুর ও ডোবা ভরাট করা হচ্ছে।
এছাড়া পত্তন ইউনিয়নের লক্ষীমোড়া ও মনিপুর এবং চর ইসলামপুর ইউনিয়নের মোহাম্মাদপুর এলাকায় দেদারসে চলছে কৃষিজমি ভরাট। সিমনা-বিজয়পুর সড়কের দুই পাশেও চোখ পড়ে ফসলি জমি ভরাটের এমন দৃশ্য।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বুধন্তী ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে প্রায় ২০টি পুকুর ভরাট করা হয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মোল্লাপাড়া ও শশইসহ কয়েকটি এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ড্রেজার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
এদিকে হরষপুর ইউনিয়নের নয়াহাটী এলাকাতেও ফসলি জমি খনন করে যেমন বড় আকৃতির পুকুর তৈরি করা হচ্ছে, তেমনি নদীর পাড় ভরাট করার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বুল্লা গ্রামের কাউসার মেম্বারের পিতার উদ্যোগে ওই এলাকায় এই ভরাট কার্যক্রম চলছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
শুধু পরিবেশের ক্ষতিই নয়, রসুলপুর-চর ইসলামপুর প্রধান সড়কের ওপর ড্রেজারের পাইপলাইন বসিয়ে যাতায়াতের মূল রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে রাস্তার ওপর পাইপ ফেলে রাখায় যানবাহন চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে, যার ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পথচারী ও চালকদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পরিকল্পিতভাবে এভাবে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে কৃত্রিম বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। এলাকাবাসী অবিলম্বে প্রশাসনের সরেজমিন পরিদর্শন এবং এই অবৈধ ড্রেজার বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারের সুনির্দিষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও বিজয়নগরে যেভাবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কৃষিজমি ভরাট চলছে, তার বিপরীতে প্রশাসনের নীরব ভূমিকা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কৃষিজমি রক্ষা করতে হলে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশাসন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুর রহমান অভিযান টোয়েন্বটিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Post Views: 133